স্যাটেলাইট কীভাবে কাজ করে? স্যাটেলাইটগুলো একে অপরের সাথে ধাক্কা খায় না কেন?

 

স্যাটেলাইট

স্যাটেলাইট কীভাবে কাজ করে? স্যাটেলাইটগুলো একে অপরের সাথে ধাক্কা খায় না কেন?

কখনো কি ভেবে দেখেছেন, আজ পর্যন্ত মানবজাতি মহাকাশের বুকে কতগুলো স্যাটেলাইট প্রেরণ করেছে? আর এতগুলো স্যাটেলাইটই যদি থেকে থাকে তাহলে তারা একে অপরের সাথে ধাক্কাই বা খায় না কেন? হয়তো বিষয়টি নিয়ে তেমনভাবে কখনো ভাবা হয় নি; কিংবা ভাবলেও সময়ের অভাবে জানার সুজোগ হয়ে ওঠে নি।

 

তবে কথা না বাড়িয়ে আজ চলুন জেনে আসা যাক, এর পেছনের মূল রহস্যটা কী??

 

স্যাটেলাইট নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রথমেই আমাদের জানতে হবে-

স্যাটেলাইট বা কৃত্তিম উপগ্রহ কী?

আমাদের মধ্যে অনেকেই রাতের আকাশ দেখতে খুব ভালোবাসি। আর আপনি যদি নাও বাসেন, তবুও পূর্নিমার চাঁদ আপনি জীবনে একবারও দেখেন নি তা কিন্তু খুব একটা জোড় দিয়ে আমাদের মধ্যে কেউই বলতে পারবেন না। হ্যাঁ , ঐ যে চাঁদ আছে না। আসলে ঐটাই একটা স্যাটেলাইট।তবে তা ন্যাচারাল বা প্রাকৃতিক স্যাটেলাইট। চাঁদ কি করে তা তো আমরা সবাই জানি। পৃথিবীর চারিদিকে সেই আদিকাল থেকে ঘুরেই যাচ্ছে।এখন পর্যন্তও কিন্তু সে এক মিলিসেকেন্ডের জন্য হলেও জিরোয় নি। সেই চাদের ধারণাকেই কাজে লাগিয়ে মানুষও একধরনের আবিষ্কার করেছে । আর তা হলো কৃত্তিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট। চাদের মত এগুলোও পৃথিবীর চারিদিকে ঘোরে। তবে এর কাজ কিন্তু চাঁদের থেকে কিছুটা ভিন্ন। চাঁদ আমাদের রাতের আকাশে হারিয়ে যাওয়া পথিককে তার পথ দেখায় ।আর কৃত্তিম উপগ্রহ গুলো আমাদের পৃথিবীর ছবি তুলে দেয়। শুধু ছবি তোলাই এদের কাজ , তা ভেবে কিন্তু আবার ভুল করবেন না। এদের আরো অনেক রকম কাজ রয়েছে। বাংলাদেশে বসে যে আপনি, ব্রাজিল কিংবা রাশিয়ার বিশ্বকাপ দেখতে পাচ্ছেন; তা কিন্তু এই স্যাটেলাইট গুলোরই ক্রেডিট।

স্যাটেলাইট নিয়ে কিছু ইতিকথাঃ 

মহাকাশের বুকে আর্টিফিসিয়াল চাঁদ পাঠানোর প্রথম পদক্ষেপটা নেয় তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন (বর্তমান রাশিয়া). ১৯৫৭ সালের ৪ অক্টোবর পৃথিবীর বুক ছেড়ে মহাকাশের উদ্দেশ্যে সফলভাবে যাত্রা শুরু করে বিশ্বের প্রথম স্যাটেলাইট স্পুটনিক ১। যার ওজন ছিল প্রায় ১৮৩ পাউন্ড। এই ভর নিয়ে এটি পুরো পৃথিবীকে একবার ঘুরে সময় নিত ৯৮ মিনিটের মত।

সেই থেকে শুরু। এরপর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বিশ্বের মোট শখানিক দেশের প্রায় ২৬৬৬ টি সক্রিয় স্যাটেলাইট পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। আর যতগুলো নষ্ট কিংবা নিষ্ক্রিয় রয়েছে তার সংখ্যা সক্রিয়দের তুলনায় প্রায় আরো দ্বিগুন। যেগুলাকে বর্তমানে স্পেস জাঙ্ক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

এখন আপনার মাথায় প্রশ্ন আসতেই পারে মহাকাশে যেহেতু এতগুলো স্যাটেলাইট, তাহলে তারা একে অপরের সাথে ধাক্কা খায় না কেন? হ্যাঁ, আজকে আমাদের আলোচনার মূল বিষয়ই সেটা।

তবে চলুন জেনে আসা যাক।

মহাকাশের স্যাটেলাইটগুলো একে অপরের সাথে ধাক্কা খায় না কেন?

এই প্রশ্নটি কেবল আপনি, আমার মাথাতেই প্রথম আসে নি। বিজ্ঞানীরা যখন মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠানোর কথা ভেবেছিলেন, ঠিক তখনই তারা এই বিষয়টিও ভেবে রেখেছিলেন।

স্যাটালাটগুলো কেন একে অপরের সাথে ধাক্কা খায় না তার কয়েকটি কারণ আমি নিচে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করবো।

১।মহাকাশের বিশালতাঃ এখন মহাকাশ তো আর এতটুকু জায়গা নয় যে সব স্যাটেলাইটগুলোকে একসাথে ভিড়াভিড়ি করে রাখতে হবে। আর যখন তারা একে অপরের কাছ থেকে এতটা দূরেই অবস্থান করছে , তাহলে তাদের ধাক্কা খাবার সম্ভাবনাও কতটা ক্ষীণ হতে পারে তা বোধ করি আন্দাজ করতে পারছেন। কিন্তু তবুও এটিকে আপনি হয়তো তেমন একটা যোক্তিক কারণ হিসেবে মেনে নিবেন না। কেননা বিজ্ঞানীরাও মেনে নেয় নি।

২।নির্দিষ্ট কক্ষপথঃ আচ্ছা বলুন তো, সূর্যের চারদিকে গ্রহগুলো ঘোরার সময় তারা একে অপরের সাথে ধাক্কা খায় না কেন? খুব সহজ, কারণ তাদের প্রত্যেকের ঘোরার জন্য নিজস্ব রাস্তা রয়েছে। এখানে রাস্তা মানে হলো তাদের কক্ষপথ। ঠিক তেমনিভাবে কৃত্তিম উপগ্রহগুলোকে তাদের  ঘোরার জন্য নিজ নিজ কক্ষপথ ঠিক করে দেয়া হয়েছে।

৩।সমকক্ষপথে অবস্থিত স্যাটেলাইটগুলোর বেগ সমানঃ এখন কথা হলো, একই কক্ষপথেও অনেক স্যাটেলাইট রাখার প্রয়োজন হয় এবং রাখাও হয়েছে। কিন্তু তারা কখনো ধাক্কা খায় না। কেন? একটু ভাবুন তো।

ধরুন একটি বৃত্তাকার রেললাইনে ৫ টি ট্রেন চলছে।একেকটি চলছে একেক গতিতে। নিশ্চয় কিছুক্ষণ পর তারা একে অপরের সাথে ধাক্কা খেতে শুরু করবে। কিন্তু আপনি যদি এখন সবগুলোর বেগ সমান করে দেন । তাহলেই কিন্তু ঝামেলা চুকে গেল। তাদের মাঝে আর সংঘর্ষ হবার সম্ভাবনা নেই। ঠিক তেমনি , সমকক্ষপথের স্যাটেলাইটগুলোর বেগও সমান করে রাখা হয়েছে। নিচের ছবিটি দেখলে আশা করি বিষয়টি আরো পরিষ্কার হবে।



 

৪।গ্রাউন্ড স্টেশন থেকে প্রতিনিয়ন স্যাটেলাইটগুলোর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হয়ঃ 

প্রত্যেকটি স্যাটেলাইটের জন্য কিছু গ্রাউন্ড স্টেশন রয়েছে। যেগুলোর মাধ্যমে স্যাটেলাইটগুলোর সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা হয়। এই গ্রাউন্ড স্টেশন থেকে প্রতিনিয়ত স্যাটেলাইটগুলোকে পর্যবেক্ষণ করা হয়। কোনো স্যাটেলাইটের যদি সামান্য কোনো সমস্যা দেখা যায়, তাহলে নিমেষের মধ্যেই সে খবর গ্রাউন্ড স্টেশনে পোছে যায়। আর তৎক্ষণাৎ যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে তা ঠিক করে নেয়া হয়। এখন কোনো স্যাটেলাইট যদি তার নির্দিষ্ট কক্ষপথ থেকে কোনোভাবে কিছুটা সরে যায় তাহলে স্যাটেলাইটে রাখা থ্রাস্ট ফায়ারিং এর মাধ্যমে তাদের আবার নির্দিষ্ট কক্ষপথে ফিরিয়ে আনা হয়।



 

তবে সংঘর্ষ যে এক্কেবারে হয় না তা কিন্তু নয়। ২০০৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার ২২৫১ নামক উপগ্রহের সাথে আমেরিকার ইরিডিয়াম ৩৩ নামক উপগ্রহের ধাক্কা লাগে। আবার ২০১৩ সালে চীনের একটি এন্টি স্যাটেলাইটের সাথে ধাক্কা লেগে রাশিয়ার পুরো একটি স্যাটেলাইট ধ্বংস হয়ে যায়। 

এমন আরো কিছু অজানা এবং রোমাঞ্চকর তথ্য পেতে আমাদের সাথেই থাকুন। বোধ করি, আমাদের সাথে কাটানো আপনার সময়টা বিফলে যাবে না।ধন্যবাদ।।

 

Comments